ডিসিসি মার্কেটে ভয়াবহ আগুন
ডিসিএফ রিপোর্টঃ রাজধানীর গুলশান ১ নম্বরের ডিসিসি মার্কেটের ভয়াবহ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ২০ ঘণ্টা পরও মার্কেটের ভেতরে আগুন জ্বলছে। ভোরের দিকে ধসে পড়েছে মার্কেটের একাংশ। ফায়ার সার্ভিেিসর ২২টি ইউনিটের পাশাপাশি নৌবাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তবে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এ আগুনকে পরিকল্পিত নাশকতার অভিযোগ করেছেন। মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যানও আগুন পরিকল্পিত নাশকতা কিনা খতিয়ে দেখতে তদন্তের দাবি করেছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক সকালে ঘটনাস্থলে এসে জানিয়েছেন, অগ্নিকান্ডে কারও মৃত্যুর কোনো তথ্য তারা পাননি। তবে দোকান ও মালামাল ব্যাপক ভস্মীভূত হয়েছে। তিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ নাশকতার সন্দেহের কথা বললেও মেয়রের ধারণা, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই ওই মার্কেটে আগুন লেগেছে। ফায়ার সার্ভিসের কমকর্তারা তাৎণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। গুশলানে দূর থেকে মনে হবে সাদা মেঘেরা উড়ে উড়ে অজানা আকাশে মিলে যাচ্ছে। ণে ণে মেঘেরা আবার কৃষ্ণ রূপও নিচ্ছে। দ্বিধায় পড়ে ফের মনে হতে পারে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে রাজধানীর গুলশান-১ এর গোটা এলাকা। কিন্তু না, ঘোর কেটে যাবে গুলশান-১ জিরোপয়েন্টের কাছে যেতেই। শরতের বিকেলে মেঘেদের খেলা নয়। আবার শীতের কুয়াশার চাদরেও ঢাকা নয়। দেশের সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশানের ডিসিসি মার্কেট পোড়ার ধোঁয়ার ‘খেলা’ এটি। শীতের খানিক কুয়াশা আর মার্কেট পোড়ার ধোঁয়া মিলে ভয়ঙ্কর এক ধোঁয়াশায় ঢাকছে গুলশান। দূর থেকে মিলছে পোড়া গন্ধও। দীর্ঘ ২০ ঘণ্টায়ও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি গুলশান ডিসিসি মার্কেটের। আগুন লাগার পর মার্কেটের একাংশ ধসে পড়েছে। সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে এ মার্কেটে আগুন লাগে। রাত ৯টা পর্যন্ত আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট আগুন নেভাতে কাজ করছে। আগুন নেভাতে নৌবাহিনীও কাজ করছে। আগুন লাগার কারণ জানতে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ এই তথ্য জানিয়েছেন। ঘটনাস্থলে থাকা ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক শরিফুল ইসলাম বলেন, মার্কেটের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বলছে। এক জায়গায় কিছুটা নিভলে অন্য দিকে জ্বলে উঠছে। পানি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে পানি আনতে সময় লাগছে। এসব কারণে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হচ্ছে। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মুসতাক আহমেদ বলেন, “ভয়াবহ আগুন লেগেছে। কীভাবে লেগছে তা বলা যাচ্ছে না। ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে।” ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ করে ডিউটি অফিসার পলাশ চন্দ্র মোদক জানান, প্রথমে আগুনের সূত্রপাত হয় মার্কেটের পূর্ব দিকে। পরে তা অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাত আড়াইটার দিকে কাজ শুরু করে। : মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী জানান, দুই তলা এই মার্কেটে দোকান আছে আড়াইশর মত। নিচতলায় বড় একটি অংশে রয়েছে আসবাবপত্রের দোকান। বেশ কিছু খাবারের দোকানও রয়েছে। দোতলায় রয়েছে আমদানি করা খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, পোশাক, প্লাস্টিক পণ্য ও গয়নার দোকান। মার্কেটের নিচতলায় গ্যাস সিলিন্ডার মেরামতের কয়েকটি দোকান আছে। সকালেও সেখান থেকে বিস্ফোরণের মত শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। নিচতলায় পূর্ব অংশে রয়েছে কাঁচাবাজার। ওই দিকেই ডিসিসি মার্কেটের লাগোয়া চার তলা গুলশান শপিং সেন্টার। তবে সেখানে আগুন লাগেনি বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানিয়েছেন। : জানা যায়, আগুনের তাপে অকেজো হয়ে ভোর সোয়া ৪টার দিকে মার্কেটের পেছনের একটি অংশ ধসে পড়ে। কাছাকাছি সময়ে ধসে পড়ে সামনের একটি অংশও। গভীর রাতে কর্মচারীদের কাছ থেকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন মার্কেটে। তাদের অনেককেই মরিয়া হয়ে মালামাল সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। যাদের দোকান তখনও অত, তারা মালামাল নামিয়ে মার্কেটের সামনের খোলা অংশে জড়ো করতে থাকেন। চোখের সামনে দোকান আর মার্কেট পুড়তে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্যবসায়ীদের কয়েকজন। এ ঘটনা নাশকতা বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। এক দোকান মালিক বলেন, মার্কেটের এক নিরাপত্তারীর কাছে রাত ২টায় তিনি আগুন লাগার খবর পান। ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ওই নিরাপত্তাকর্মী তাকে জানিয়েছেন। আরেক দোকানি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার কসমেটিকসের দোকান ছিল দোতলায়। চোখের সামনে সব ছাই হয়ে গেল, কিছুই করতে পারলাম না।” : দোকান মালিক সমিতির এক নেতাকে ফায়ার সার্ভিসের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ভোর পৌনে ৫টার দিকে মার্কেটের একদল ব্যবসায়ী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ওপর চড়াও হলে তারা সরে যান। প্রায় ১৫ মিনিট পর পানি নিয়ে নতুন করে আগুন নেভাতে শুরু করেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, পানির স্বল্পতার কারণে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে। পেছনের লেক থেকে পানি এনে কাজ চালাচ্ছেন তারা। : গুলশান মার্কেটে সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর ডিএনসিসি মার্কেটের অধিকাংশ দোকান পুড়ে গেছে। মার্কেটের অন্যান্য দোকানের মালামাল সরিয়ে রাস্তায় নামিয়ে রাখছেন মালিকরা। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পাশের গুলশান শপিং সেন্টারের প্রায় সব দোকানের মালামাল রাস্তায় নামিয়ে রাখা হয়েছে। গুলশান-১ গোল চত্বর ও আশপাশের সড়কে যত্রতত্র রাখা হয়েছে দামি চেয়ার, টেবিল, খাট, ড্রেসিং টেবিল, সোফা, আলমারি, এসি, নামি শোপিস, ডাইনিং টেবিলসহ গৃহসজ্জার নানা সরঞ্জাম। এসব মালামালে প্রায় ভরে গেছে গুলশানের রাস্তা। অনেকে আবার ট্রাকে নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছেন এসব জিনিসপত্র। মার্কেটের ফার্নিচার দোকান মালিক আবুল হোসেন বলেন, যে কোনো সময় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মালামাল নিরাপদ দূরত্বে সরানোর চেষ্টা করছি। তবে মালামাল খোয়া যাওয়ার ভয়ও কাজ করছে। তাই নিরাপত্তা দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বার বার অনুরোধ জানাচ্ছি। ডিএনসিসি মার্কেটের রিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক রুনা আহমেদ আহজারি করে বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ ফায়ার সার্ভিস। তারা ঠিক মতো পানি দিলে আগুন হয়তো নিভে যেত। আমার দেড় কোটি টাকার মালামাল আছে দোকানে। সব শেষ হয়ে যেতে বসেছে। : : ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, মার্কেটের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বলছে। এক জায়গায় কিছুটা নিভলেও অন্যদিকে জ্বলে উঠছে। পানি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে পানি আনতে সময় লাগছে। ফলে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হচ্ছে। অন্যদিকে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মহাখালী-গুলশান, গুলশান-২ থেকে গুলশান-১ ও হাতিরঝিল এবং বাড্ডা লিংক রোড থেকে গুলশান-১ এলাকায় যাতায়াতের রাস্তা অনেকটাই বন্ধ। ফলে যাত্রীবাহী গাড়ি চলছে ধীরগতিতে। : সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে এসে মেয়র আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “স্বাভাবিকভাবে মনে হয় বিদ্যুতের আগুন। এতে দাহ্য পণ্য, খাবার, পারফিউম... কোনো জীবনহানি হয়েছে বলে আমাদের জানা নাই।” : মেয়র বলেন, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশের ভবন যাতে তিগ্রস্ত না হয় সে চেষ্টাও তারা করছেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে কত সময় লাগবে তা বলা সম্ভাব হচ্ছে না। : এক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল বলেন, “নাশকতা কিনা, এটা মেয়রের পে বলা সম্ভব না, মেয়র নাশকতা এক্সপার্ট না। পুলিশ ভালো বলতে পারবে। তবে মেয়র হিসেবে আমার মনে হয়, নাশকতা না হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ পারসেন্ট।” : পাকা মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এস এম তালাল রিজভী বলেন, রাত আড়াইটার দিকে আগুন লেগেছে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান। “তখন ফায়ার সার্ভিসের মাত্র দুটি ইউনিট ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটের স্বল্পতার কারণে দুই মার্কেটই আগুনে পুড়েছে। ভোর ৪টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট বাড়ানো হয়। আগে বাড়ালে তি এত হত না।” ফায়ার সার্ভিস তাৎণিকভাবে য়তির আর্থিক পরিমাণ জানাতে না পারলেও দুই মার্কেট মিলিয়ে কমপে দেড়শ কোটি টাকার তি হয়েছে দাবি করেন রিজভী। ১২৯ নম্বর দোকানের মালিক মো. বাবু বলেন, “মার্কেট বিক্রি হয়েছে কয়েকবার। ভাঙতে না পেরে সিস্টেমে ফেলে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারে কেউ আগুন দিয়েছে।” ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের ছিল খেলনার দোকান। দুদিন আগে নতুন মাল তুলেছিলেন তিনি। দেলোয়ার বলেন, “একটা সুতাও বের করতে পারি নাই। সব জিনিসপত্র ছাই হয়ে গেছে। যারা মার্কেট ভাঙার ষড়যন্ত্র করছিল তারাই আগুন দিয়েছে। এই মার্কেটটা ঘিরে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হত। সবার জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।” : ডিসিসি কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি ১৯ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন সিদ্দিকী জানান, সাত বিঘা জমির ওপর এই মার্কেটের পাকা মার্কেট অংশটি আছে ১৯৬২-৬৩ সাল থেকে। ১৯৮২ সালে সিটি করপোরেশন কাঁচা মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেয়। ২০০৩ সালে মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সময়ে মার্কেটের জায়গায় পিপিপির আওতায় ১৮ তলা গুলশান ট্রেড সেন্টার নির্মাণের দরপত্র দেয়া হয়। সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েও তা করতে অপারগতা জানালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা মেট্রো গ্রুপের আমিন অ্যাসোসিয়েটস ওভারসিজ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে সিটি করপোরেশন কর্তৃপ। ওই চুক্তিতে বলা হয়, ভবনের আটতলা পর্যন্ত থাকবে দোকান, নয় থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত হবে অফিস। দুই হাজার ২৪টি দোকানের মধ্যে ডিসিসি পাবে ২৭ শতাংশ। আর আমিন অ্যাসোসিয়েটস ৭৩ শতাংশ দোকান পাবে এবং তা বিক্রি করে লাভ তুলে নেবে। কিন্তু বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই চুক্তি স্থগিত করে ভবনে ডিসিসির মালিকানা বাড়াতে বলা হয়। এরপর ডিসিসির মালিকানা বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করে নতুন চুক্তি হয়। কিন্তু দোকান মালিক সমিতি এরপর মামলা করলে ঠিকাদার কোম্পানি সেখানে আর ভবন তুলতে পারেনি বলে জানান ডিসিসি কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শের মোহাম্মদ। : তিনি বলেন, “সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং মেট্রো গ্রুপ এই নাশকতার সঙ্গে জড়িত।” ডিসিসি পাকা মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সহ-সভাপতি জয়নাল আবেদিনও একই সন্দেহের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “এটা পরিকল্পিতভাবে কেউ করেছে। আমরা দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাচ্ছি। দোকান মালিকদের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে দুপুরে মেট্রো গ্রুপের গুলশান কার্যালয়ে গেলে দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলছেন, নাশকতা নয়, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই আগুন লেগেছে বলে তিনি ধারণা করছেন। : মার্কেটের আগুন কীভাবে লেগেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। এ বাহিনীর পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, “একটা বিল্ডিং কলাপস করেছে। কোনো ক্যাজুয়ালটি হয়নি। এখানে কমবাস্টেবল ও ফেইমে লিকুইড ছড়িয়ে আছে। ডেঞ্জারাস জিনিসপত্র আছে।” : দুপুরে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ অগ্নিকান্ড দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা- তা খতিয়ে দেখতে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি পুলিশ, দোকান মালিক ও স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা একটি তদন্ত কমিটি করা উচিৎ। ব্যবসায়ীরা ফায়ার সার্ভিসের কাজে ধীরগতির অভিযোগ আনলেও অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ফায়ার সার্ভিস বলছে, মার্কেটে অগ্নি নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। : এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাঁচা মার্কেট সমিতির সহ-সভাপতি হুমায়ুন সিদ্দিকী বলেন, তাদের গোটা ১৫ এক্সটিংগুইশার ছিল। আগুন লাগার পর সেগুলো ব্যবহার করে নেভানোর চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। : ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “কীভাবে আগুন লেগেছে তা তদন্ত করে দেখা হবে।” : রাজধানীর গুলশানের ডিসিসি মার্কেটের ভয়াবহ আগুন কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়িয়ে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে ব্যবসায়ীদের। উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে আরিক অর্থেই পথে বসার উপক্রম হয়েছে অনেক ব্যবসায়ীর। সকালে ঘটনাস্থলে সরেজমিনে গিয়ে মার্কেট চত্বরের সামনে কাঁদতে দেখা গেছে অনেক ব্যবসায়ীকে; চোখের সামনে নিজে দোকানের জিনিসপত্র পুড়তে দেখা এই ব্যবসায়ীরা তাদের শোক, ােভ, উত্তেজনা ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। আকস্মিক এই বিশাল তি কীভাবে সামলে উঠবেন তা নিয়ে ভাবতেও পারছেন না তারা। আনোয়ার হোসেন (৩৫) নামে ব্যবসায়ী বলেন, তার বাবা ১৯৭২ সাল থেকে এই মার্কেটে ব্যবসা শুরু করেন। মার্কেটে তাদের তিনটি খাবারের দোকান ছিল, যার সবগুলোই পুড়ে ছাই।” গতকালও আমি কোটিপতি ছিলাম। এখন রাস্তার ফকির। ডিসিসি (পাকা) মার্কেটের ১২১ নম্বর দোকানটিতে কার্পেটের দোকান ছিল ষাটোর্ধ্ব বাবর আলীর। দোকানে প্রায় ২৫ লাখ টাকার কার্পেট ও থান কাপড় ছিল বলে জানান তিনি। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “কী বলব বাবা, আমার সব তো শেষ। কিছু মাল বের করতে পারছি, বেশির ভাগ মালই রয়ে গেছে।” আগুন বাড়তাছে। কী জানি হয়? ছেলেরা ধোঁয়ার জন্য মালামাল বের করতে পারছে না।” এই মার্কেটের ১০১ নম্বর দোকানের বাই-সাইকেল ব্যবসায়ী আবু ইউসুফ জনি হতাশ কণ্ঠে বলেন, “মালামাল বের করার চেষ্টা করতেছি, কিন্তু ধোঁয়ার জন্য পারতেছি না।” ২০ বছর আগে নোয়াখালী থেকে খালি হাতে ঢাকায় এসেছিলেন মো. রাসেল (৩২)। পড়াশোনা ও ঢাকায় থাকার খরচ চালিয়েছেন টিউশনি করে। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় ৫৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে প্রসাধনীর দোকান দিয়েছিলেন তিনি। ভেঙে পড়া কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার একমাত্র মেয়েকে এই বছর স্কুলে ভর্তি করিয়েছি। তাকে যে আগামীকাল স্কুলে পাঠাব তার রিকশা ভাড়াও আমার কাছে নাই। “এখানে বড় বড় লোকজন আসছে, মিডিয়ার সামনে কথা বলছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা যে তির সম্মুখীন হয়েছে, তার তিপূরণের বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলছে না।” : দুদিন আগেই নতুন মাল কিনে দোকানে তুলেছিলেন খেলনা বিক্রেতা দেলোয়ার হোসেন। তিন সন্তানের জনক এই ব্যবসায়ী বলেন, “(দোকান থেকে) একটা সুতাও বের করতে পারি নাই। সব জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই মার্কেটটা ঘিরে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হত। সবার জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।