এ বছর সীমান্ত হত্যা
ডিসিএফ রিপোর্টারঃমোদী ও মমতার আশ্বাস, বিজিবি-বিএসএফের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক এবং স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে কোনো কিছুতেই থামছে না বিএসএফের বুলেট। ক্রমশই তাদের বুলেট ধেয়ে আসছে সীমান্তের নিরীহ মানুষের দিকে। আস্তে আস্তে প্রাণঘাতী হচ্ছেন তারা। সীমান্ত হত্যা শূন্যে আনার অঙ্গীকার করেও তা প্রতিনিয়ত ভঙ্গ করছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বিগত বছরের চেয়ে চলতি বছরে আরো বেশি প্রাণঘাতী হয়েছে তারা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা আর দেশি-বিদেশি চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশি নিরীহ মানুষের উপর চালিয়ে যাচ্ছে হত্যাযজ্ঞ। কাউকে করা হচ্ছে গুলি, কাউকে নিয়ে যাচ্ছে তুলে। কারও লাশ মিলছে ডোবায়, কারও কাঁটাতারে। কেউ আবার বেঁচে থাকছেন পঙ্গুত্ব নিয়ে। সর্বশেষ গতকাল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত এলাকা থেকে এক গরু ব্যবসায়ীকে বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধরে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি হলো উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের মাসুদপুর ঠুটাপাড়া বড়গীপাড়া গ্রামের আনারুল হক টুকুর ছেলে তোতা (২২)। আনারুল হক টুকু জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মাসুদপুর বিওপির অধীনস্থ সীমান্ত পিলার নং ১/৫ এস এলাকায় বাংলাদেশের ২০০ গজ অভ্যন্তরে গমের জমি থেকে আমার ছেলে গরু ব্যবসায়ী তোতাকে ভারতের নিমতিতা (টেন্ট) ক্যাম্পের বিএসএফরা ধরে নিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আমি মাসুদপুর ক্যাম্পের নিকট মৌখিক অভিযোগ করেছি। মাসুদপুর বিওপির কমান্ডার উমর আলি জানান তার মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা বিএসএফের সাথে কথা বলেছি। তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর আগে লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত আসাদুজ্জামানের (২২) লাশ দুই দিন পর ফেরত দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীÑবিএসএফ। গত ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উপস্থিতিতে আদিতমারী থানা পুলিশের কাছে মরদেহ ফেরত দেয় বিএসএফ। : মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, গত চার বছরের তুলনায় চলতি বছর সীমান্ত হত্যা অনেকটা বেড়ে গেছে। এ বছর ভারতীয় সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫ জন বাংলাদেশি। একই সংস্থার হিসাবে যা ২০১৪ সালের চেয়ে ১২ জন বেশি। ওই বছর এই সংখ্যাটা ছিল ৩৩। আরেক মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর হিসাবে, ২০১৩ সালে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৯ জন। ২০১২ সালে ৩৮ জন আর ২০১১ সালে ৩১ জন। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৪ জন, আর ২০০৯ সালে ৯৬ জন। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের আট বছরে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৩৪৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়। অর্থাৎ এই সরকারের আমলে প্রতি বছর গড়ে ৪৪ জন করে নিহত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই বছরে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় মোট ১৮২ জন। এর মধ্যে ২০০৮ সালে ৬২ জন এবং ২০০৭ সালে ১২০ জন নিহত হয়। : এদিকে বিজিবি এক পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সীমান্ত হত্যা এ বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেড়েছিল। তবে এই মাস থেকে তা কমে এসেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, সেপ্টেম্বরে বিজিবি-বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের বৈঠক এবং স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর হত্যা কমতে শুরু করেছ। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা বন্ধে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। এরই মধ্যে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছে। সামনে আরও কমবে। তবে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, সীমান্ত হত্যা বেশি বা কম সেটা আমার কাছে গুরুত্বপ্র্ণূ নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এটা বন্ধ হয়নি, চলমান রয়েছে। এটাকে শূন্যে নিয়ে আসার বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। নুর খান বলেন, সবসময়ই সীমান্তে হত্যার বিষয়টি নিয়ে অবহেলা করা হয়। বিএসএফ সদস্যদের বিচারহীনতার কারণেই এটা ঘটে চলেছে। অনেক সময়ই তারা সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করছে না। : এক প্রশ্নের জবাবে নূর খান বলেন, ‘ইমপিউনিটির সুযোগ যেন বিএসএফ না নিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা দরকার। এছাড়া সীমান্তে যৌথ মহড়া থাকা উচিত। চোরাচালান বন্ধে দেশের অভ্যন্তরেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করা যাবে না, সেই নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি আমাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মর্যাদাকর অবস্থান নেয়া দরকার বলেও মনে করেন নূর খান। : জানতে চাইলে সাবেক কূটনীতিক মোহাম্মদ জামির জানান, সীমান্ত হত্যা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এটি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমাদের সীমান্ত দিয়ে ভারতে কেউ প্রবেশ করলে তাদের তো গুলি করা হয় না। কিন্তু ভারতের সীমান্তে কেউ প্রবেশ করলেই গুলি করা হয়। এটা ঠিক নয়। বরং যে ব্যক্তি প্রবেশ করে তাকে আইনের আওতায় নিতে পারে বিএসএফ। সেটা না করে হত্যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত ২০ ডিসেম্বর পিলখানায় বিজিবি দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা আমাদের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজিবির প্রচেষ্টায় বিএসএফের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের ফলে সীমান্তে নিহতের ঘটনা কমে এসেছে। : দায় আছে বিজিবিরও : বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তে বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের গুলি বরাবরই এক আলোচিত ঘটনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গরু চোরাচালান করতে গিয়ে খুন হয় বাংলাদেশিরা। কাঁটাতারের বেড়া কেটে বা বেড়া ডিঙিয়ে পার হওয়ার সময় গুলি করে বিএসএফ। : গত এক দশকে বিএসএফ এবং বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে প্রায় প্রতিটি বৈঠকেই সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এমনকি প্রাণঘাতী বুলেটের বদলে গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হলে রাবার বুলেট ছোঁড়ার কথাও একাধিকবার জানিয়েছে বিএসএফ। কিন্তু এর কোনো অঙ্গীকারই রাখা হয়নি। সীমান্ত হত্যার জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় গরু চোরাচালানকে। ভারত সরকার গরু চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও এই চোরাচালান বন্ধ হয়নি। আর বিজিবিও এই বিষয়টিকে চিহ্নিত করলেও প্রকারান্তরে বাংলাদেশ গরু চোরাচালানকে উৎসাহিত করে। : চোরাচালান করে গরু আনা হয় ক্যাটেল বিট বা খাটালে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক পরিশোধ করলে সে গরু বৈধতা পেয়ে যায়। বিজিবি নিজেও এই চোরাচালান বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে নানা সময়। কিন্তু এই খাটাল বা শুল্ক নিয়ে চোরাচালান করে আনা গরু বন্ধে কোনও উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীÑবিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, ‘গরু এভাবে শুল্ক দিয়ে বৈধ করা উচিত না। আমিও মনে করি এটা বন্ধ হওয়া উচিত। আমরা এই চেষ্টা করবো।
