মসজিদের মাইকে ব্যান্ড সঙ্গীত

মসজিদের মাইকে ব্যান্ড সঙ্গীত
"গোয়ালন্দে আ. লীগের সংবর্ধনায় মসজিদের মিনারে বাঁধা মাইকে ব্যান্ড সংগীত" ডিসিএফ রিপোর্টঃ গোয়ালন্দে আওয়ামী লীগের নবনির্বচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সংবর্ধনায় মসজিদের মিনারে মাইক বাঁধা হয়।
এশার নামাজের সময় সেই মাইকে বাজতে থাকে ব্যান্ড সংগীত। নামাজ শেষে মুসল্লিারা ক্ষুব্ধ হলে মাইক নামানো হয়।
শুক্রবার বিকালে গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় কার্যালয়ে নবনির্বচিত রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ফকীর আঃ জব্বার ও সদস্যদের সংবর্ধনার আয়োজন করে। সংবর্ধনা উপলক্ষে গোয়ালান্দ বাজার বাসষ্ট্যান্ড মহাসড়ক থেকে পুরো গোয়ালন্দ বাজার মাইকের হর্ণ বাঁধা হয়। দুটি হর্ণ বাঁধা হয় ঐ মসজিদের মিনারে। এশার নামাজের সময় মাইকে উচ্চ ভলিউমে ব্যান্ড সংগীত বাজতে থাকে। ঐ অবস্থায় নামাজ শেষ করার পর মুসল্লিারা বাইরে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানায়। আঃ আজিজ নামে এক মুসল্লি আয়োজকদের বিষয়টি অবগত করার পর ঐ দুটি হর্ণ বন্ধ করে নামিয়ে ফেলা হয়। এসময় উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আল মাহমুদ মিশা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মুসল্লিদের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান। উপস্থিত মুসল্লিরা এসময় বলেন, এত বড় একটা দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজকদের বিষয়টি আগেই নজরে আসা উচিত ছিল।

ঢালাইকৃত সিমেন্টের আস্তরে স্ত্রীর লাশ, যুবলীগ নেতা আটক

ঢালাইকৃত সিমেন্টের আস্তরে স্ত্রীর লাশ, যুবলীগ নেতা আটক
নিহত নাসিমার লাশ
গাজীপুরের কালীগঞ্জের নাগরী ইউনিয়নের রাথুরা এলাকায় ঢালাইকৃত সিমেন্টের আস্তর ভেঙে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। 
  
বুধবার সকালে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। 
  
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ওই নারীর দ্বিতীয় স্বামী যুবলীগ নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুমকে তার বাড়ি থেকে আটক করেছে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। 
  
কালীগঞ্জ থানার ওসি আলম চাঁদ যুগান্তরকে বলেন, উদ্ধারকৃত লাশটি নাগরী ইউনিয়নের সাবেক সংরক্ষিত ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের নারী মেম্বার ও ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি শফিকুল ইসলাম মাসুমের ২য় স্ত্রী নাসিমা বেগমের।  
  
পুলিশ জানায়,

সালাহউদ্দিন আহমেদ এর জামিন শুনানি

সালাহউদ্দিন আহমেদ এর জামিন শুনানি
বিএনপির বানিজ্য বিষয়ক সম্পাদক,ঢাকা মহানগর বিএনপির অন্যতম যুগ্ন আহবায়ক, ঢাকা ৪ ও ৫ আসনের সাবেক সফল সাংসদ জনাব আলহাজ্ব
সালাহউদ্দিন আহমেদকে আজ বুধবার দায়রা জজ আদালতে জামিনের








শুনানির জন্য হাজির করা হয়।
এসময়ে উপস্থিত থাকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর বিএনপির আহবায়ক জনাব মির্জা আব্বাস,ঢাকা মহানগর বিএনপির অন্যতম সদস্য জনাব তানভীর আহমেদ রবিন,
যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির অন্যতম নেতা মিজান ভান্ডারী,যাত্রাবাড়ী থানা ছাত্রদল এর সাধারণ সম্পাদক শামীম মাহমুদ,সিঃ সহ-সভাপতি মোঃ জসিম,যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক শান্ত ইসলাম জুম্মন,যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম,যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মোঃ পিয়াল,৮৫ নং ওয়ার্ড ছাত্রদল এর অন্যতম ছাত্রনেতা রাসেল আহমেদ শিফাত সহ আরো অনেকে। এসময় সালাহউদ্দিন আহমেদ এর সাথে মির্জা আব্বাসকে একান্তভাবে সাক্ষাত করতে দেখা যায়।

জিয়া নগর এখন ইন্দুরকানী

জিয়া নগর এখন ইন্দুরকানী
জিয়া নগরের নাম পরিবর্তন

  • ডিসিএফ রিপোর্টঃ পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলার নাম পরিবর্তন করে ইন্দুরকানী করা হয়েছে। সোমবার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।


এটা যে হাসিনার হিংসাত্মক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ তা বুঝে জিয়া নগরবাসীর বিন্দু পরিমান সন্দেহ নেই বলে স্থানীয় এক কৃষক জানান।

তারেক রহমান এর আত্মকাহিনী

তারেক রহমান এর আত্মকাহিনী
দ্বিতীয়বারের মতো রোববার, মার্চ ৬, ২০১৬ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলবিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তারেক রহমান। শনিবার, মার্চ ১৯, ২০১৬ দলের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে সারা দেশ থেকে আগত ৩০০০ কাউন্সিলর এর অনুমোদন দেন।  তিনি আগামী তিন বছর, ২০১৯ পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করবেন।
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৮, ২০০৯ ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি প্রথমবারের মতো সংগঠনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০২ সালে তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান।
তিনি ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ শুরু করেন।
জন্ম
তারেক রহমান প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সন্তান। তাঁর ডাক নাম পিনো।   ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর তিনি বগুড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন।
শিক্ষা জীবন
তারেক বাংলাদেশের সেরা দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ হতে মাধ্যমিক ও নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন পরে পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন তিনি। বর্তমানে তারেক রহমান লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে উচ্চতর পড়াশুনা করছেন।
রাজনীতি

তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটান। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তিনি দলের সাংগঠনিক কর্মকান্ডে যুক্ত হন।
তারেক রহমান ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের তথ্য ও গবেষণা সেল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। সৃজনশীল পরিকল্পনায় দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণা চালান। নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১৫টি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়ে ১০ অক্টোবর সরকার গঠন করে। ২০০২ সালে তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির জেষ্ঠ্য যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।
২০০২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তিনি বিএনপিকে সারা দেশে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য কার্যকর ও অভূতপূর্ব কর্মসূচী গ্রহণ করে  আলোড়ন তৈরি করেন। সারাদেশে সংগঠিত করেন তৃণমূল প্রতিনিধিসভা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কোন যুগান্তকারী কর্মসূচী অন্য কোন রাজনীতিবিদ করতে পারেননি। মূল সংগঠন সহ সহযোগী সংগঠন যেমন জাতীয়তাবাদী যুব দল, জাতীয়তাবাদী ছাত্র দল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে তারেক রহমান কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন ও মাঠপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও মতামত গ্রহণ করেন। সারাদেশে ২৩টি এলাকায় উন্নয়ন প্রতিনিধি সভা করে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে সুসংহত করেন। এসব সভায় দলের তৃণমূল নেতারা বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিলে তিনি এসব পরামর্শ সুপারিশ আকারে সরকারের বিবেচনার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দেন।
তিনি কর্মীদের ভোটে গঠন করেন বগুড়া বিএনপি কমিটি। কেন্দ্র থেকে কমিটি চাপিয়ে না দিয়ে তিনি শুরু করেন নিজ দলের ভিতর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।
এইভাবে তারেক রহমান শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তানের পরিচিতি থেকে বেরিয়ে এসে দলের একজন দক্ষ সংগঠক ও সক্রিয় নেতা হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন।
জেল জীবন
বুধবার, মার্চ ৭, ২০০৭ মধ্যরাতে তারেক রহমানকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় তাঁর ঢাকা ক্যান্টমেন্টস্থ মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন অবৈধ স্বঘোষিত সরকার। বাংলাদেশেকে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব শূণ্য করতে বিদেশী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জেলে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তারেক রহমানের উপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক বর্বর শারিরিক ও মানুষিক নির্যাতন। তাঁর পায়ে, কোমরে এমন নির্যাতন করা হয় যে তিনি হাঁটতে পারছিলেন না।
জেল মুক্তি
সোমবার, আগস্ট ২৫, ২০০৭ খবর ছড়িয়ে পড়ে যে তারেক রহমান তার হাসপাতাল কক্ষে পা পিছলে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। এরপর এ খবরের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ ও ধারণা সৃষ্টি হয় যে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনকে গোপন করার লক্ষ্যে এই খবর ছড়ানো হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দেখা দেয়, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।তারেক রহমানের মুক্তির দাবিতে চাপ বাড়তে থাকে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিরা তারেককে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান।
২০০৮ এর আগস্টে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতে গতি লাভ করে। প্রায় আঠারো মাস ব্যাপী নিপীড়িত অবস্থায় কারান্তরীণ থাকার পর বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০০৮ তারিখে সবগুলো মামলায় তারেক রহমানের জামিন সম্পন্ন হয় ও তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি লাভ করেন।
লন্ডনে বসবাস
বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০০৮ তারেক রহমান উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন। বর্তমানে লন্ডনের সাউথ ওয়েলিংটন হসপিটাল ও লন্ডন হসপিটালে তার চিকিৎসা চলছে এবং চিকিৎসার সুবিধার্থে তিনি সেন্ট্রাল লন্ডনের এডমন্টনে স্বপরিবারে বসবাস করছেন।
ব্যক্তিগত জীবন
তারেক রহমান সাবেক নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের কনিষ্ঠা কন্যা ডাঃ জোবায়দা রহমানকে বিয়ে করেন। জোবায়দা
লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে চার বছরের মাস্টার্স অব কার্ডিওলজি কোর্স সম্পূর্ণ করেন। তিনি ডিস্টিংশনসহ শতকরা ৮৩ ভাগ নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এই কোর্সে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইউই), কমনওয়েলথভুক্ত দেশ নাইজেরিয়া এবং চীনসহ মোট ৫৫টি দেশের ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ডা. জোবায়দা রহমান সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে প্রথম হয়েছেন।
তাঁদের একমাত্র সন্তান জাইমা রহমান লন্ডনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ছেন।


বেগম খালেদা জিয়ার আত্মকাহিনী

বেগম খালেদা জিয়ার আত্মকাহিনী
বেগম খালেদা জিয়া, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী (১৯৯১-​১৯৯৬, ২০০১-​২০০৬) এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপাসন। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগষ্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইস্কান্দর মজুমদার ব্যবসা উপলক্ষে জলপাইগুড়িতে বসবাস করতেন। তার আদি নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী থানায়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর জলপাইগুড়িতে চা ব্যবসা ছেড়ে তিনি দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দিনাজপুর মিশনারী স্কুলে খালেদা জিয়া প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে ১৯৬০ সালে দিনাজপুর বালিকা হাইস্কুল থেকে এস এস সি পাস করেন। ওই বছরই তৎকালীন ক্যাপটেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সঙ্গে তার বিয়ে হয়। খালেদা জিয়া ১৯৬৫ সাল পযন্ত দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন এবং এরপর তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে তার স্বামীর কর্মস্হলে গমন করেন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধে সূচনালগ্নে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে মেজর কর্মরত জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং পরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে ‘জেড’ ফোর্সের অধিনায়কত্ব লাভ করেন। খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হেফাজতে নেয়া হয় এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর তিনি মুক্তিলাভ করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকানডের পর তার প্রতিিষ্ঠত বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কঠিন সংকটের সম্নুখীন হয়। দলের তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং দেশের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এইচ, এম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুথথানেরর মাধ্যমে উৎখাত করেন এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশে সামরিক আইন জারি করেন।
দলের এ সংকটকালে ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সহসভাপতি এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে চেয়ারপারসন পদে নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৯৮৩ সালে সাতদলীয় জোট গঠন করে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম অবতীণ হয়। এরশাদের স্বৈরশাসন অবসানের লক্ষ্যে পরিচালিত ৯ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম খালেদা জিয়া অবৈধ সরকারের সঙ্গে কোনোপ্রকার আপাস করেননি। বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞামূলক আইনের দ্বারা তার স্বাধীন গতিবিধিকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। আট বছরে সাত বার তাকে অন্তরীণ করা সত্তেও খালেদা জিয়া জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত কারার আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন।
অবশেষে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সম্মিলিত জোট কতৃক সংগঠিত গনঅভ্যুথথানের মুখে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি নিরদলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একক সংখ্যাগরিষঠ দল হিসেবে নির্বাচিত হয়। জিয়া সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলি আসনেই বিজয়ী হন।
১৯৯১ সালের ২০ মার্চ খালেদা জিয়া দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। খালেদা জিয়ার উদ্যোগে রাষ্ট্রপতি-শাসিত থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় উত্তরণের লক্ষ্যে ১৯৯১ সালের ৬ আগাস্ট জাতীয় সংসদ সংবিধানের ঐতিহাসিক দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাস হয়। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় অধীনে খালেদা জিয়া ১৯ সেপ্টেম্বর প্রাধনমন্ত্রী হিসেবে পুনরায় শপথ গ্রহন করেন।
১৯৯৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়যুক্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়া দ্বিতীয় মেয়াদে প্রাধানমন্ত্রীর পদ আসীন হন। উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচিন পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সন্নিবেশিত করে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের‍৩০ মার্চ একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগের নিকট পরাজিত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (১৯৯৬-​২০০১) সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে খালেদা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর বিচারপতি লতিফুর রহমানের নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার-দলীয় জোট সংসদ দুই-তৃতীয়াংশেরও অধিক আসনে বিজয়ী হয়। ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিলঃ রপ্তানি আয় ও বিদেশ থেকে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স দ্রুত বৃদ্ধি, শিল্প ও টেলিযোগাযোগ খাতের দ্রুত বিকাশ, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র ঊধবমুখী ধারা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নকল্পে অপারেশন ক্লিন হার্ট ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) গঠন এবং জেএমবি ও হুজিসহ ইসলামী মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বত্বক অভিযান। মেয়াদ শেষে তিনি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ২০০৭-​০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি ভিত্তিহীন মামলা রুজু করে তাকে প্রায় একবছর কারাবন্দী রাখা হয়। বর্তমান জাতীয় সংসদ খালেদা জিয়া বিরোধী দলীয় দায়িত্ব পালন করেছেন।
শাসনকালীন সাফল্য
১৯৯১ সালের ২০ মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথবারের মতো শপথ নেওয়ার ৩৯ দিনের মাথায় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস দক্ষিণ বাংলাদেশের একটি বিস্তীণ অঞ্চল আঘাত হানে। ত্রাণ ও পূর্ণবাসন সামগ্রীর অপ্রতুলতা সত্বেও সরকার দুযোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করে। খালেদা সরকার প্রথম মেয়াদে মূল্যস্ফীতির হারকে সর্বনিম্ন পযায়ে নামিয়ে আনা এবং শিল্প ও কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি প্রসারিত করা হয়, যার মাধ্যমে বেসরকারি বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যক্তিখাতের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে, বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝরি শিল্পের ক্ষেত্রে। এতে কোনোপ্রকার বাধানিষেধ ছাড়াই শতভাগ বিদেশি মালিকানা ও যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হয়। খালেদা সরকার পশুসম্পদ খাতকে সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা দান করে, যার ফলে দেশব্যাপী অসংখ্য গবাদি অ হাঁস-মুরগীর খামার ওঠে। এসময় দেশে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রাকে আংশিক বিনিময়যোগ্য করা হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ সর্বোচ্চ পযায়ে পৌছায়। দেশের উন্নয়ন বাজেটে বিদেশি সহায়তার উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়া হয়। এর ফলে পাঁচ বছরে উন্নয়ন বাজেটে দেশিয় সম্পদের হিস্যা ২১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৯৯৩-​৯৪ অর্থবছরে দেশে প্রথমবারের মতো উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর প্রবত্তন করা হয়, যার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হয়। পাশাপাশি, সরকার মুক্ত-বাজার ও বাণিজ্যিক উদারিকরণ নীতিমালার অংশ হিসেবে আমদানি পর্যায়ে ব্যাপক হারে শুল্ক হ্রাস করা হয়।
এসময়ে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে খাল-খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করা হয়। চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে (১৯৯০-​৯৫) শিক্ষা খাতের অনুকূলে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয় যার ৭০ শতাংশই ছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপ-খাতের জন্য। খালেদা সরকার একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এবং শিক্ষা উৎসাহিত করার জন্য ব্যক্তিখাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা অনুমোদন করে। দেশের মানুষের দ্রুততম সময়ে স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অধীনে একটি পৃথক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৩ সালের ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শিক্ষালাভে আগ্রহী করে তুলতে খালেদ সরকার ১৯৯৩ সালে ‘শিক্ষার বিনিময় খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করে। পল্পী অঞ্চলে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করা হয় এবং মাধ্যমিক পর্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য দেশব্যাপী একটি উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করা হয়।
দেশের আইন ও বিধিবিধান অব্যাহতভাবে হাল-নাগাদ করার লক্ষ্যে খালেদা সরকার একটি স্থায়ী আইন কমিশন গঠন করে। দেশের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেও নেওয়া হয়। তাৎপযপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলঃ ১৯৯৪ সালের ১৬ অক্টোবর যমুনা বহুমূখী সেতুর ভৌত– নির্মাণ শুরু করা, মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করা, চট্টগ্রাম একটি অত্যাধুনিক রেলস্টেশন নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের উন্নীত করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ। এসময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথমবারের মতো বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পের প্রস্ততিমূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়। এবং এগুলোর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে চীনা ও কোরীয় সংস্থার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৩ সালের এপ্রিল সপ্তম সার্ক শীর্ষ সন্মেলন আয়োজন এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সার্কের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভামমূতি উজ্জলতর হয়। দেশের ইতিহাস প্রথমবার সিএনএন ও বিসিসি’র মতো স্যাটেলাইট চ্যানেলকে সম্প্রচার করার সুযোগ দেওয়া হয় এবং ধারাবাহিকতায় অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলও দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। বাংলাদেশের মোবাইল টেলিফোনের যাত্রাও এসময়ে শুরু হয়।
খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে গৃহীত কিছু উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে ছিলঃ চাকুরীজীবিদের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স-সীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা; পেনশনের বিধান করা; শ্রমিকদের জন্য ১৭টি খাতে নূন্যতম মজুরি নিধারন তদারকির জন্য সিকিউরিটিজ নিধারণ; বঙ্গোপসাগর জলদস্যুতা ও চোরাচালান হ্রাসে কোস্ট-গাড বাহিনী প্রতিষ্ঠা; দেশের শেয়ারবাজার তদারকির জন্য সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠন। এসময়ে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুিষ্ঠত হয়েছিল।
আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির দিক তৃতীয় খালেদা সরকার (২০০১-​০৬) দেশের জন্য আরো ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসে। ২০০২-​০৬ সময়কালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে থাকে। বিদেশে থেকে প্রেরিত রেমিটেন্সের পরিমান পাঁচ বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়ে ২০০৬ সালে ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। ২০০৫ সালে থেকে তৈরি পোশাক খাতে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সরকারের বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি ও কৌশলের করণে শিল্পখাতে যে অগ্রগতি অর্জিত হয় তার ফলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মার্চেন্ট ব্যাংকার গোল্ডম্যান-স্যাকস বাংলাদেশের বিশ্বের দ্রুত উদীয়মান ১১টি দেশের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করে, যাতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত অ চীনের মতো দেশও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০২-​০৬ সময়কালে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পরিমাণ ২. ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ২০০৬ সালে মার্চ পর্যন্ত বিনিয়োগ বোর্ডে ৬২ হাজার কোটি টাকার ৯ হাজার শিল্প-প্রকল্প নিবন্ধিত হয়, যা পূর্বেবতী পাঁচ বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। এর ফলে ২০০৫-​০৬ সালে জিডিপি’তে শিল্পখাতের অবদান ১৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশ অতিক্রম করে। ২০০৪-​০৫ অর্থবছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া ও লোকসানি আদমজী পাটকলের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পাওনা টাকা পরিশোধের পর সেখানে একটি নতুন রপ্তনি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল চালু করা হয়।
জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্প্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের সাথে সাযুজ্য রেখে খালেদা সরকার মধ্যে-মেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে একটি ‘দারিদ্র নিরসন’ কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। দারিদ্র নিরসনের জন্য বাজেট বরাদ্দের হার প্রতিবছরই বৃদ্ধি করা হয় এবং ২০০৬-​০৭ অর্থবছর এর হিস্যা দাঁড়ায় মোট ৫৬ শতাংশ। পল্লী অঞ্চল অতি দরিদ্র অ সুবিধাবঞ্ছিত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র হ্রাসের জন্য সরকার সামজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি সম্প্রসারিত করে। দেশের উত্তারাঞ্চলে মঙ্গাপ্রবণ এলাকায় কর্মসংস্থান সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৫০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়। চরাঞ্চলে বসাবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থান উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প (চর জীবিকায়ন কর্মসূচি) গ্রহণ করা হয়। এসময়ে দেশের দারিদ্র হার ৯ শতাংশ হ্রাস পায়। সমাজের পশ্চাৎপদ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলাদের মাসিক ভাতা ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা উভয়ই বৃদ্ধি করা হয়। বয়স্ক ভাতা ও ভাতাগ্রহীতার সংখ্যা উভয়ই বাড়ানো হয়। পরিবেশ সংরক্ষণেও খালেদা সরকার কিছু উল্লেয্যেগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিল। বিশ বছরের বেশি পুরনো বাস ও ট্রাককে রাস্তা থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং ২– স্ট্রোক ইঞ্জিনের ডিজেল-চালিত বেবী- ট্যাক্সি উঠিয়ে দিয়ে তাদের স্থলে ৪– স্ট্রোক ইঞ্জিন বিশিষ্ট সিএনজি চালিত বেবী- ট্যাক্সি রাস্তায় নামানো হয়। দেশব্যাপী পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হায়।
খালেদা সরকার শিক্ষাখাতেও অনেক সাফল্য অর্জন করে। প্রাথমিক স্কুল ভর্তি হার ৯৭ শতংশে উন্নীত করা হয়, ছাত্রীদের শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক করা হয়, প্রায় দুই কোটি ছাত্রীকে শিক্ষা-উপবৃত্তির আওতায় আনা হয় এবং বিদ্যালয়সমূহ ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। মেয়েদের জন্য ২ টি নতুন ক্যাডেট কলেজ ও ৩টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় চট্টগ্রামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর ঊইমেন প্রতিষ্ঠার উদ্যেগ নেওয়া হয়। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নের পাশাপাশি খালেদা সরকার কওমি মাদ্রাসাসমূহের ‘দাওয়া’ সনদকে স্বীকৃতি দেয় এবং ফাজিল ও কামিল ডিগ্রীকে ব্যাচেলর ও মাস্টাস ডিগ্রির সমতূল্য ঘোষণা করে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেগুলোর বেশিরভাগই ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত। অনেকগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যক্রম পরিচালনায় অনুমতি দেওয়া হয়; বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং দেশব্যাপী এধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫১ থেকে ৬৪টিতে উন্নীত করা হয়।
সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দেওয়া ও এসংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নে খালেদা সরকার বেশ কয়েকটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা ৩১ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়, নতুন জেলাশহরে শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ এবং পুরনো জেলা শহরের হাসপাতাল ১০০থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তছাড়া কয়েকটি নতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালও প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকারি পদক্ষেপের কারণে দেশের শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার ক্রমাম্বয়ে হ্রাস পায়।
খালেদা সরকার টেলিযোগাযোগ খাত উন্নয়নের উপরও যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করে। তার দায়িত্বগ্রহণের সময়কার প্রায় ৭ লক্ষের তুলনায় মেয়াদশেষে দেশে সরকারি ফিক্সড ফোনের সংখ্যা ১২ লক্ষ বিশ হাজারে উন্নীত হয়। বেসরকারি ফিক্সড ফোন সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও ২০০৬ সালে দেড় লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। দেশের ৬৪টি জেলায় ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন করা হয় এবং উপজেলাগুলোকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল টেলিফোন নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়। খালেদা শাসনকালে দেশে ফিক্সড ও মোবাইল টেলিফোনের মোট সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে যায়। টেলিফোন সংযোগ ও কলরেটের হার ব্যাপক হারে হ্রাস করা হয়। সাধারণ জনগণের কাছে ফিক্সড ফোন সহজলভ্য করতে ১৭টি বেসরকারি কোম্পানিকে ফিক্সড ফোন সেবা প্রদানের লাইসেন্স দেওয়া হয়। পাশাপাশি, সরকারি মালিকানাধীন টেলিটক কোম্পনিও সাধারণ জনগণকে মোবাইল টেলিফোন সেবা প্রদান করে। একটি সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে সংযুক্তির মাধ্যমে এসময়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক তথ্য মহাসড়কের সাথেও সংযুক্ত হয়। এর ফলে বৈদেশিক যোগাযোগ, উপাত্ত বিনিময় ও ইন্ট্রারনেট ও যোগাযোগ দ্রুততর, সস্তা ও সহজলভ্য হয়।
এসময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দেশে ৮৯ হাজার কিলোটার নতুন ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন করা হয়। বিদ্যুৎ গ্রাহকের হার এসময়ে ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৭ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। কড়াকড়ি আরোপের কারণে বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস ২৮ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২২ শতাংশে নেমে আসে। প্রায় ৫০ হাজার গ্রাম পল্লী বিদ্যুতায়নের আওতায় চলে আসে। খালেদা জিয়া সরকার ১৫টি নতুন উপজেলা সৃষ্টি করে, যার ফলে উপজেলার সংখ্যা ৪৮০তে উন্নীত হয়। সরকার প্রথমবারের মতো কর ন্যায়পালের পদটিও সৃষ্টি করে। খালেদা জিয়ার সরকারের তৃতীয় মেয়াদে ঢাকা ও ত্রিপুরায় আগরতলার মধ্যে সরাসরি বাস সার্ভিস চালু হয় এবং ঢাকা কলকাতা মধ্যে সরাসরি ট্রেন চলাচলের বিষয়টিও চূড়ান্ত করা হয়। তাছাড়া এসময়ে যমুনা সেতুর উপর দিয়ে দেশের পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এ সময়ে নির্মিত কিছু উল্লেখযোগ্য সেতুর মধ্যে ছিলোঃ ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে শিকারপুর ও দ্বারিকা সেতু, পদ্মা নদীর উপর ফকির লালন শাহ (পাকশী) সেতু, খুলনা-মংলা মহাসড়কে রূপসা নদীর উপর খান জাহান আলী সেতু, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে আড়িয়াল খাঁ নদীর উপর হাজী শরীয়তউল্লাহ সেতু, হেমায়েতপুর-সিঙ্গাইর সড়কে ধলেশ্বরী সেতু, মধুমতি নদীর উপর মোল্লারহাট সেতু, ঢাকার বাবুবাজারে বুড়িগঙ্গা সেতু, কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারি সড়কের উপর ধরলা সেতু, ডাকাতিয়া নদীর উপর চাঁদপুর সেতু এবং কুশিয়ারা নদীর উপর ফেঞ্চুগঞ্জ সেতু। কুয়েত সরকারের আর্থিক সহয়তায় খালেদা সরকার আরেকটি যে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন তা ছিল চট্টগ্রামে তৃতীয় কর্ণফুলী বা শাহ আমানত সেতু।
খালেদা জিয়ার সরকার জাতীয় সংসদ আইন পাশের মাধ্যামে দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পরিবর্তে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে। তাঁর সরকার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল ২০০৫ সালে সরকার কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা।
খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদে বাংলাদেশের জাতিসংঘের ১৩টি অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। এর মধ্যে ছিলঃ জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ, শান্তি-নির্মাণ কমিশন ও জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ। তাছাড়া এ সময়ে বাংলাদেশের আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের সদস্য করা হয়। ২০০৫ সালে সাক শীর্ষ সম্নেলনে আয়োজনের পর তিনি এই সংস্থার চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষার কার্যক্রমে সর্বোচ্চ সংখ্যাক সৈন্য প্রেরণ করে বিশ্বব্যাপী শান্তি-উদ্যেগেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর সাথেও পারস্পরিক কল্যাণকর সম্পর্ক দৃঢ়তর করার প্রয়াস চালায়। অতীতের মতো এই সরকারও জোটনিরপেক্ষ ও স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির ভিক্তিতে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়।

শহীদ জিয়ার আত্মকাহিনী

শহীদ জিয়ার আত্মকাহিনী
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ক্ষনজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। নানা কারণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তার সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম,পরিশ্রমপ্রিয়তা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণাবলি এ দেশের গণমানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তার যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে তা জোটেনি। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার ওপর ছিল প্রচণ্ড আস্থাশীল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার ওপর মানুষের এই আস্থায় কোনো চিড় ধরেনি।
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী থানার বাগবাড়িতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মনসুর রহমান কলকাতায় একজন কেমিস্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। শৈশব ও কৈশোরের একটি সময় গ্রামে কাটিয়ে পিতার সাথে কলকাতায় এবং দেশ বিভাগের পর করাচিতে চলে যান জিয়াউর রহমান। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে তিনি কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে অসীম সাহসিকতার সাথে একটি কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তার কোম্পানি যুদ্ধে সবচেয়ে অধিক খেতাব লাভ করে। সৈনিকজীবনে তিনি যেমন চরম পেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন ঠিক জাতীয় সব সঙ্কটকালেও শক্ত হাতে হাল ধরেছেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী যখন নিরস্ত্র জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, নেতারা যে যে দিকে পারেন আত্মগোপন কিংবা পালিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, জিয়াউর রহমান তখন চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বিশ্বসম্প্রদায়কে বাংলাদেশের মানুষের এ ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামে সমর্থনের আবেদন জানান। ৯ মাসের মুক্তি সংগ্রামে তিনি একটি সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে সমরনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বীর উত্তম খেতাব লাভ করেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জিয়ার সামরিক জীবন
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানকে কুমিল্লায় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার নিয়োগ করা হয় এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ-অফ-স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে এবং বছরের শেষের দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
৭ই নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লব
১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবে নস্যাৎ হয়ে যায় প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র। আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন থেকে রক্ষা পায় বাংলাদেশ। এদিন সিপাহী-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঢাকা সেনানিবাসের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে আনেন তত্কালীন সেনাপ্রধান ও স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।
১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চিত অবস্থা বিরাজ করছিল। হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী দল সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটালে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনা সাধারণ জনগণ ও সিপাহীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে, বিশেষত সিপাহীদের কাছে ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ এক বিপ্লব, যা ইতিহাসে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে স্থান লাভ করেছে। দেশবাসী সেদিন জিয়ার হাতেই তুলে দিয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব।
রাষ্ট্রপতি জিয়া
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহি জনতা বিপ্লবের পর তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ১৯শে নভেম্বর ১৯৭৬ সালে তাঁকে পুনরায় সেনাবাহিনীর চীফ অফ আর্মী স্টাফ পদে দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন করা হয় এবং উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয়। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ৮ই মার্চ মহিলা পুলিশ গঠন করেন, ১৯৭৬ সালে কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ ৭ জাতি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালেই তিনি উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্বোধন করেন। ১৯৭৬ সালের ২৯শে নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৬ সালে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন, ১৯৭৭ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি একুশের পদক প্রবর্তন করেন। ২১শে এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিয়া দেশে আবার গণতন্ত্রায়ণের উদ্যোগ নেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৭৮ সালের ৩রা জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব প্রদান করে তা জনপ্রিয় করে তোলেন। বাংলাদেশে বহু মতের ও ধর্মের নানা জাতিগোষ্ঠী বাস করে। তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার মাত্রা ও ধরন একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাই জিয়া মনে করেন যে, ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নয়, ভূখণ্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা উচিত। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ঐক্য ও সংহতির ওপর গুরুত্ত্ব আরোপ করেন এবং এই ধারণা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালান।
আইনশৃঙ্খলা
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জিয়াউর রহমান দেশে শান্তি শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে আত্মনিয়োগ করেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করেন। পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ করে তিনি তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা গ্রহণ করেন। সশস্ত্র বাহিনীতেও তিনি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি কঠোর প্রশিক্ষণ ব্যাবস্থার মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পেশাগত শৃঙ্খলা উন্নয়নের কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং তাদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করেন। সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে যথেষ্ট সফল হলেও জিয়াউর রহমানকে বেশ কয়েকটি সেনা-বিদ্রোহ ও সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার মোকাবেলা করতে হয়।
বহুদলীয় গণতন্ত্র
নির্বাচন ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং অবাধ রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান যত দ্রুত সম্ভব রাজনীতির গণতন্ত্রায়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলগুলিকে তাদের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এইভাবে, তিনি সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন, সংবাদপত্রের মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনে তিনি ৭৬.৬৭% ভোট রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়া এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন এবং এই দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক এ. কিউ. এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন। বিএনপির সব থেকে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি। প্রায় ৪৫% সদস্য শুধুমাত্র রাজনীতিতে নতুন ছিলেন তাই নয়, তারা ছিলেন তরুণ। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়াও প্রায় দুই ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের আহবায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথমে ১৮ জন সদস্যদের নাম এবং ১৯শে সেপ্টেম্বর ওই ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য যে, ২৮শে আগস্ট ১৯৭৮ সালে নতুন দল গঠন করার লক্ষ্যে জাগদলের বর্ধিত সভায় ওই দলটি বিলুপ্ত ঘোষণার মাধ্যমে দলের এবং এর অঙ্গ সংগঠনের সকল সদস্য জিয়াউর রহমান ঘোষিত নতুন দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে।
আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন
জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য:
  • সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান।
  • জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি।
  • বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া।
  • দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব।
  • সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারী সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন।
  • গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান।
  • গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন।
  • গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা।
  • হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ।
  • ২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ।
  • নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ।
  • কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি।
  • কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তানীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ।
  • যুব উন্নয়ন মন্ত্রাণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ।
  • ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্টা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ।
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন।
  • তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণ এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন।
  • জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ।
  • তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি।
  • দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ।
  • বেসরকারিখাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ।
  • জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যোর রপ্তানীর দ্বার উন্মোচন।
  • শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর জিয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতিমালায় বিশেষ পরিবর্তন আনেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তির দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে বিশেষ একটি কূটনৈতিক অবস্থানের সৃষ্টি হয়, যার ফলে বাংলাদেশের সাথে প্রতিবেশী ভারত সহ সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধুত্ব ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক নৈকট্য গড়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক স্নায়ু যুদ্ধের তৎকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেন যার দুটি মূল দিক ছিল সোভিয়েত ব্লক থেকে বাংলাদেশের সরে আসা ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক স্থাপন করা। জিয়াউর রহমান সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাতীত প্রাচ্যের আরেক পারমাণবিক শক্তি চীনের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি সংস্কার প্রক্রিয়ার আওতায় আরও ছিল বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরব বিশ্বের সাথে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ, যে সম্পর্কে স্বাধীনতার পর থেকেই শৈতল্য বিরাজ করছিল। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সুবিধা ও উপকারিতা বাংলাদেশ আজও পুরোমাত্রায় উপভোগ করছে কেননা বর্তমানে সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলে পরিণত হয়েছে তার রূপরেখা জিয়াই রচনা করে গিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সাথে স্থাপিত সম্পর্ক অনেকটা অর্থনৈতিক হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে স্থাপিত সম্পর্কে সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলোও প্রাসঙ্গিক ছিল। বিশেষ করে চীনের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর পূণর্গঠনের কাজ অনেকটা তরান্বিত করেছিলেন। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অস্ত্রাগারের দিকে তাকালে সেই সত্যই প্রতিফলিত হয়। সামরিক পূণর্গঠনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সাথে উন্নত কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে জিয়া রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহন সংস্থা বিমানের আধুনিকীকরণও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
প্রাথমিক ভাবে এসব সংস্কার বৃহত্তর প্রতিবেশী ভারতের সাথে সামান্য দূরত্ব সৃষ্টির ইঙ্গিত বহন করলেও জিয়াউর রহমান যে আঞ্চলিক সহায়তাকে গুরুত্ব দিতেন সেই সত্যের প্রতিফলন ঘটে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহায়তা সংস্থা (সার্ক) গঠনে তাঁর উদ্যোগ ও অবদানের মধ্য দিয়ে। যেহেতু ভারত সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন ছিল, স্নায়ুযুদ্ধের অপরপক্ষ অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ কূটনৈতিক নৈকট্য ভারতের সাথে দূরত্ব সৃষ্টির একটি কারণ হতে পারত। চীনের সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন সদ্যস্থাপিত সুসম্পর্কও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।[৪] কিন্তু জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে আঞ্চলিক প্রতিযোগীতার বদলে সহযোগীতা স্থাপিত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে যার ফলে বাংলাদেশ সহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলো উপকৃত হবে। এই লক্ষ্যে তিনি সার্কের রূপরেখা রচনা করেন যা পরে ১৯৮৫ সালে বাস্তবে রূপ নেয় ও প্রতিষ্ঠিত হয় সার্ক।
মৃত্যু
সামরিক বাহিনীর মধ্যে পেশাগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের জন্য জিয়া একটি মহলের সমালোচনার মুখোমুখি হন। জিয়ার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভেতরে বাইরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। এসব স্বত্বেও জিয়া তার দলের স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘটিত এক কলহ থামানোর জন্য ১৯৮১ সালের ২৯শে মে চট্টগ্রামে আসেন এবং সেখানে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন। তারপর ৩০শে মে গভীর রাতে সার্কিট হাউসে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে বিপথগামী কিছু সামরিক কর্মকর্তার এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হন। জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে দাফন করা হয়। জেনারেল জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমাগম ঘটে।